
ব্যাংকে টাকা রেখে কেন মানুষের ঘুম হারাম?
পঙ্ক্তি ডেস্ক:দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমছে না—বরং দিন দিন তা আরও গভীর হচ্ছে। মধ্যবিত্ত, প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবার, ব্যবসায়ী এবং অবসরপ্রাপ্ত আমানতকারীদের একটি বড় অংশ এখনো একই প্রশ্নের মুখোমুখি—“ব্যাংকে রাখা টাকা আদৌ কতটা নিরাপদ?”
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংক খাতের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যা—বিশেষ করে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট, পরিচালনা পর্ষদ ঘিরে বিতর্ক, একীভূতকরণ প্রক্রিয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বারবার হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর ফলেই আমানত বাড়লেও স্বস্তি বাড়ছে না।
অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংকিং খাতেও আমানত বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৭৬ ট্রিলিয়ন টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৯ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
ব্যাংকে টাকা, কিন্তু মানসিক স্বস্তি নেই
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় দেখা যাচ্ছে, অনেক গ্রাহক এখন দীর্ঘমেয়াদি এফডিআর না করে স্বল্পমেয়াদি আমানত করছেন। কেউ আবার এক ব্যাংকে বড় অঙ্ক না রেখে একাধিক ব্যাংকে ভাগ করে রাখছেন।
একজন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, “মানুষ এখন আর শুধু লাভের কথা ভাবছে না, বরং টাকা ফেরত পাবে কি না—সেটাই প্রধান চিন্তা।”
আন্দোলন ও অনিশ্চয়তা: আমানতকারীদের ক্ষোভ বাড়ছে
গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ব্যাংকের আমানত ফেরত না পাওয়ার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলছে। বিশেষ করে কিছু সংকটে থাকা ব্যাংকের গ্রাহকেরা বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক শাখা এমনকি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত গ্রাহকেরা বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে আমানত তুলতে না পারা, মুনাফা বন্ধ থাকা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এক আন্দোলনকারী আমানতকারী বলেন, “আমরা শুধু আমাদের নিজের টাকাই ফেরত চাই। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে শুধু আশ্বাস পাচ্ছি।”
তারল্য সংকট ও একীভূতকরণ নিয়ে উদ্বেগ
সংকটে থাকা কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে নতুন একটি ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্তের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এসব ব্যাংকের সব আমানত ফেরত দিতে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন, যা তাৎক্ষণিকভাবে জোগান দেওয়া সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতিতে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ব্যাংক পুনর্গঠন দীর্ঘমেয়াদে ভালো হলেও স্বল্পমেয়াদে এটি গ্রাহক আস্থায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
নতুন ব্যাংক আইন: আস্থার সংকট আরও বাড়ছে?
সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, নতুন আইনের কিছু ধারা দুর্বল ব্যাংকের সাবেক মালিকদের আবারও নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এতে অতীতের অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের চক্র আবার ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। আর সেই আশঙ্কাই সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
খেলাপি ঋণ: সবচেয়ে বড় আস্থার সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের আস্থাহীনতার মূল কারণ হলো লাগামহীন খেলাপি ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি।
এর আগের সময়ে এ হার আরও বেশি ছিল। অর্থাৎ কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ব্যাংকারদের মতে, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ঋণ পুনঃতফসিলের প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
মূল্যস্ফীতি: সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যাচ্ছে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ হলেও তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কারণ আমানতের সুদের হার অনেক ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
ফলে মানুষ এখন বিকল্প বিনিয়োগে ঝুঁকছে—স্বর্ণ, জমি, ডলার এবং সঞ্চয়পত্রে।
আস্থার সংকটই মূল চ্যালেঞ্জ
ব্যাংক খাতকে অর্থনীতিবিদরা “আস্থার ব্যবসা” হিসেবে অভিহিত করেন। তাই একটি ব্যাংকের সংকট পুরো খাতের ওপর প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে—
খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুর্বল ব্যাংকের স্বচ্ছ পুনর্গঠন করতে হবে।
আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ উদ্যোগের পাশাপাশি তথ্য প্রকাশে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ বাড়লেও মানুষের মনে যে প্রশ্ন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, তা হলো—“টাকা জমা আছে ঠিকই, কিন্তু তা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কতটা?”
এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন স্পষ্টভাবে না আসবে, ততদিন ব্যাংকের ভল্টে টাকা বাড়লেও মানুষের মনে স্বস্তি বাড়বে না।
