
নতুন পররাষ্ট্র সচিবের জন্য যত চ্যালেঞ্জ
পঙ্ক্তি ডেস্ক: ব্যাপক নাটকীয়তার পর যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়ামকে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার অফিসার সিয়ামকে সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার পরে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি। সচিব হিসেবে পদোন্নতির জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের অনুমোদন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত শেষ করবে সরকার।
এদিকে মাত্র আট মাস কাজ করার পরেই পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টার দফতরের মনোভাব বুঝতে না পারা এবং তাদের চাহিদা ও ইচ্ছা পূরণ করতে না পারার কারণে ওই দফতরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কেন তৈরি হয়েছে দূরত্ব
গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কাজ সম্পাদনের জন্য যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টা বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতেন। মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অনুবিভাগের মহাপরিচালকরা (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা) বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে ব্রিফ করতেন।
রাষ্ট্রদূত নিয়োগের বিষয়েও গত ৯ মাসে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে কোনও হস্তক্ষেপ করা হয়নি। এমনকি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনগুলোতে পদায়ন করা নিয়ে বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও পদায়নে বিরোধিতা করেনি প্রধান উপদেষ্টার দফতর। রাষ্ট্রদূত নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হলে জানুয়ারি মাসে সরকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ ও বদলির জন্য একটি কমিটি গঠন করে দেয়, যা পছন্দ করেননি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। আরেকটি কারণ হচ্ছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকারের সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শৃঙ্খলা ফিরে না আসার বিষয়টিও নজরে এসেছে প্রধান উপদেষ্টার দফতরের।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে নতুন যে ব্যবস্থা কাজ করছে—তার ভিত্তিতে দূতাবাসগুলো কীভাবে কাজ করবে, সেটির বিষয়ে গত ৯ মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কোনও দিকনির্দেশনা দেয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান অবস্থান
সূত্র বলছে, প্রধান উপদেষ্টার দফতরসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান খাটো হয়েছে এবং দূরত্ব বাড়ছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। গত মার্চ মাসে প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের পর এ বিষয়ে জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। সাধারণত বিদেশ সফরের বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে।
চীন থেকে ফিরে আসার পর ওই সফরের গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধান উপদেষ্টার দফতর বেইজিংয়ের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণের জন্য একটি সমন্বয় সভার আয়োজন করে। চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণী বৈঠকে পররাষ্ট্র সচিব বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনও কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না।
গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করলে অন্তর্বর্তী সরকার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ থেকে ২২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে যায়। সেখানেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনও প্রতিনিধি ছিলেন না। তখন বলা হয়েছিল—যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এ বিষয়ে সহায়তা দেবে। মে মাসে প্রধান উপদেষ্টার জাপান সফর এবং দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য টোকিও’র সঙ্গে ১৫ মে ফরেন অফিস কনসালটেশনে পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দিনের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। হঠাৎ করে পররাষ্ট্র সচিবের নির্দেশে সেটি স্থগিত করার জন্য নোট ভার্বাল পাঠানো হলে প্রধান উপদেষ্টার দফতর এতে হস্তক্ষেপ করে। প্রধান উপদেষ্টার দফতরের নির্দেশে তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়। উল্লেখ্য, ফরেন অফিস কনসালটেশন সম্পূর্ণভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব বিষয় এবং এর নেতৃত্ব কে দেবে, সেটি মন্ত্রণালয়ই ঠিক করে থাকে। কিন্তু এফওসি স্থগিত করার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে প্রধান উপদেষ্টার দফতরকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
পররাষ্ট্র সচিবের করণীয়
বাংলাদেশে কূটনীতি হচ্ছে আলোচনার একটি জনপ্রিয় বিষয়। চায়ের দোকানের ক্রেতা থেকে শুরু করে করপোরেট অফিসের বড় কর্তারাও এখন কূটনীতি নিয়ে তাদের জ্ঞান জাহির করে থাকেন। তবে, কূটনীতি একটি বিশেষায়িত বিষয় এবং ডিপ্লোমেসি করার জন্য দরকার পর্যাপ্ত বুদ্ধিভিত্তিক উৎকর্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং লজিস্টিক।
সাবেক একজন কূটনীতিক বলেণ, ‘পররাষ্ট্র সচিবকে সাহসের সঙ্গে বুদ্ধিভিত্তিক উৎকর্ষতা দেখাতে হবে। একটি সরকারি সিস্টেমে বিভিন্ন শক্তি তাদের বিভিন্ন স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। এর মধ্যে বিদেশ-সম্পর্কিত বিষয়গুলোর নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য পররাষ্ট্র সচিবকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে হবে।’
আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘নেতিবাচক প্রচারণা এখন বাংলাদেশের নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন পররাষ্ট্র সচিবকে কেন্দ্র করে এখন জোরালো আকারে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হওয়ার একটি আশঙ্কা রয়েছে। এই নেতিবাচক প্রচারণাকে ভয় পেয়ে কাজ থেকে দূরে থাকলে চলবে না। এগুলো সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।’
উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে সামাজিক গণমাধ্যমে আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে। রাশিয়ায় বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ফয়সাল আহমেদ সরকারের রীতি-নীতি ভঙ্গ করে ফেসবুক পোস্টে বৃহস্পতিবার (২২ মে) লিখেছেন, ‘হযবরল সেগুনবাগিচায় কে পররাষ্ট্র সচিব হবেন, নিশ্চিত নয়। একজন অতিরিক্ত সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে ১০ জন সচিবকে ডিঙ্গিয়ে কেন তড়িঘড়ি করে পররাষ্ট্র সচিব করা হচ্ছে বোধগম্য নয়। আসাদ আলম সিয়াম শেখ হাসিনার লয়ালিস্ট হিসেবে তিন বছর চিফ অব প্রটোকল ছিলেন। আওয়ামী লীগের ইন্টারেস্ট সার্ভ করার জন্যই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আসাদ আলম সিয়ামকে নির্বাচনকালীন সময়ে পররাষ্ট্র সচিব করতে চান।’
আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন কীভাবে করতে হয়, সেটি কূটনীতিকরা জানেন। তবে, অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের মধ্য থেকে জাতীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য পররাষ্ট্র সচিবকে কাজ করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা পররাষ্ট্র সচিবের পক্ষে করা সম্ভব নয়। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র সচিব যৌথ চেষ্টায় কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন, সেটি সময়ই বলে দেবে।’সাবেক আরেকজন কূটনীতিক বলেন, ‘দেশের সংকটকালীন সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত দায়িত্বের চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার কারণে তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ওই সময়ে ৩+৫ মেকানিজম বা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করাসহ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যার সুফল পেয়েছিল বাংলাদেশ। বর্তমান সংকটময় সময়ে ওই ধরনের সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে নতুন পররাষ্ট্র সচিবকে।’
