ঈদ করার আশায় বইসা আছে বাড়ির লোকজন, নজরুল মর্গে, আমি থানায়

ঈদ করার আশায় বইসা আছে বাড়ির লোকজন, নজরুল মর্গে, আমি থানায়

পঙ্​ক্তি ডেস্ক: পরিবারের সঙ্গে একত্রে ঈদ উদযাপন করতে বাড়ি ফেরার পথে সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে রডবোঝাই একটি ট্রাকে ওঠেন ২৪ যাত্রী। মধ্যরাত হওয়ায় পথিমধ্যে ট্রাকের যাত্রীরা ঘুমিয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় ট্রাকের চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে ফেলে দেন। এতে যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ রড ও ট্রাকের চাকার নিচে চাপা পড়েন। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ১৫ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। বেশ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। মুহূর্তের মধ্যেই ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের আহাজারি চলছে। এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

সোমবার (২৫ মে) ভোর ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের কালিহাতি উপজেলার সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে ফেনী ও চট্টগ্রামসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে রডবোঝাই ট্রাকে করে উত্তরবঙ্গের পথে রওনা দিয়েছিলেন তারা। রবিবার দুপুরে চট্টগ্রাম থেকে তরিকুল ইসলাম রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন শ্যালক নজরুল ইসলাম ও শ্যালকের ছেলে তুহিন। ঈদ উপলক্ষে কম ভাড়ায় বাড়ি যাওয়ার জন্য তারা ট্রাকের আরোহী হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের বাড়ি ফেরা হয়নি

এর মধ্যে তরিকুল ইসলাম বেঁচে যান। ঘটনাস্থলেই নিহত হন নজরুল ইসলাম। আহত হন তুহিন। তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ির লোকজন আশায় বইসা আছে, আমরা দুপুরের মধ্যেই পৌঁছাইয়া যামু। কিন্তু নজরুল রইছে মর্গে, তুহিন হাসপাতালে আর আমি থানায় আছি। নজরুলের লাশ কহন বুইঝা পামু জানি না। লাশ পাওয়ার পর বাড়ি নিয়া যামু।’

তরিকুল ও তার সহযাত্রীরা চট্টগ্রামে ‘হরেক মালের’ ব্যবসা করেন। চট্টগ্রাম থেকে জনপ্রতি পাঁচ শ টাকা ভাড়ায় রাজশাহী পর্যন্ত যাওয়ার জন্য ট্রাকে উঠেছিলেন। তাদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায়। চট্টগ্রামের অলংকার মোড় থেকে রবিবার বেলা ১টায় তারা চার জন ট্রাকে ওঠেন। ট্রাকটি সন্ধ্যায় ফেনী পৌঁছালে সেখান থেকে আরও ১৮ জন আরোহী নেয়।

নিহত ১৫ জনের মধ্যে সাত জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্র বাড়ি এলাকার সাকিম মিয়ার ছেলে সাগর মিয়া, একই এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম, রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাতানপুর এলাকার আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নজরুল ইসলাম, মামুন, নওগাঁর নেয়ামতপুর মালঞ্চী এলাকার সাইদুলের ছেলে সারিকুল।

দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া রাব্বানি নামের এক যাত্রী বলেন, ‘আমরা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলাম। হঠাৎ দেখি ট্রাকটি উল্টে গেছে। এরপর আর কিছুই বলতে পারবো না। ট্রাকে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তারা চট্টগ্রাম ও ফেনী এলাকায় হকারের কাজ করতেন।’

ট্রাকের যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রাকটি নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলায় যাওয়ার কথা ছিল। আমরা কয়েকজন চাঁপাইনবাবগঞ্জে যাওয়ার জন্য চট্টগ্রামের অলংকার থেকে উঠেছিলাম। মূলত বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা চাওয়া হয়। কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে আমরা ট্রাকে উঠি। আমরা চার জনে ২৩০০ টাকা দিই। এর মধ্যে আমার দুই জন স্বজন মারা গেছে। টাকা বাঁচাতে গিয়েই এমন মৃত্যু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘ফেনী থেকে প্রায় ১৮ জন একসঙ্গে ট্রাকে ওঠেন। এ ছাড়াও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে আরও কয়েকজন ওঠেন। হতাহতরা সবাই মূলত পেশায় হকার; কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্য ফেরি করে বিক্রি করতেন।’

টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন যাত্রী খোরশেদ আলম জানান, ঢাকা শহর পার হওয়ার পর কোথাও যানজটে পড়তে হয়নি। সবাই ট্রাকে বহন করা রডের ওপর ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে উল্টে যায়। কিছুক্ষণ পর খোরশেদ আলম দেখেন, তিনি ট্রাকের কাছেই পড়ে আছেন। এ সময় অনেকে রডের নিচে চাপা পড়ে কাতরাচ্ছিলেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল এসে তাদের উদ্ধার করে।

এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে দায়িত্বরত আশরাফুল ইসলাম নামের এক সদস্য বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছয় জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

যমুনা সেতুর পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানী বলেন, ‌‘ট্রাকটির যাত্রীরা ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী। কম ভাড়ায় গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তারা রডবাহী ট্রাকে উঠেছিলেন। ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আর ৮-৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হবে। নিহতদের স্বজনরা এলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে। ট্রাকচালক ও হেলপারের এখনও হদিস পাওয়া যায়নি।’

টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোপালপুর সার্কেল) ফৌজিয়া হাবিব খান বলেন, ‘নিহত অন্যদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। নিহতদের স্বজনরা এলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে। ঈদযাত্রায় মালবাহী খোলা ট্রাকে যাত্রী পরিবহন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

Share This